ফিরে দেখা ৭১ : ডিজিটাল মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ

Untitled-1

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের দলিল সংরক্ষণ করা জরুরি। আর এ কাজটি সহজে করা সম্ভব তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে। ডিজিটাল যুগে প্রযুক্তির কল্যাণে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ধরে রাখার পাশাপাশি এ গৌরবকে সহজে গোটা বিশ্বের কাছে তুলে ধরার কাজটিও সহজ হবে। নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তিপ্রেমী তরুণ-তরুণীরা নানা বিষয় জানতে চাইলেই ইন্টারনেটে ঢোকে।প্রযুক্তির এ যুগে তাই মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস নিয়ে ওয়েবসাইট, ডিজিটাল আর্কাইভ ইত্যাদি বেশ প্রয়োজনীয়। বিষয়টি নিয়ে দেশে সরকারি-বেসরকারি ও ব্যক্তি পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সংগ্রহশালা ও গ্রন্থাগার তৈরির কাজ চলছে। দু-একটি অনলাইন বিশ্বকোষেও আছে আমাদের গৌরবের নানা তথ্য। তবে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এখনো সমন্বিত কোনো ডিজিটাল বা অনলাইন সংগ্রহশালা নেই। এমন একটি সংগ্রহশালার উদ্যোগ দ্রুত নেওয়া জরুরি।

নানা মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ
ইন্টারনেটে বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে রয়েছে উল্লেখযোগ্য বেশ কিছু তথ্য। এতে পাওয়া যাবে থানা, জেলা ও বিভাগভিত্তিক মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা। শুধু তা-ই নয়, আলাদাভাবে বীরশ্রেষ্ঠ, বীর-উত্তম ও বীর-বিক্রম খেতাব পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকার পাশাপাশি বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে। পাশাপাশি রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টরভিত্তিক ইতিহাসের খবর। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি-উদ্যোগেও ডিজিটাল মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধকে তুলে ধরার কাজটি করে যাচ্ছেন অনেকেই। এসব উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বেশ কিছু ওয়েবসাইট। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বড় এবং তথ্যসমৃদ্ধ নানা তথ্য পাওয়া যাবে অনলাইনে মুক্ত বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়ায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক পাতায়। পাশাপাশি বাংলা ভাষায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানা যাবে উইকিপিডিয়ার বাংলা ওয়েবসাইটে। এই ওয়েব ঠিকানার শেষ অংশটি ইউনিকোড বাংলায় লিখতে হবে। উইকিপিডিয়ায় বিনামূল্যে নিবন্ধনের মাধ্যমে ইচ্ছা করলেই আপনিও যোগ করতে পারেন মুক্তিযুদ্ধ-সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য। মুক্তিযুদ্ধের নানা স্মৃতির খবর নিয়ে রয়েছে অনলাইনে সক্রিয় এক জাদুঘর। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ওয়েবসাইটেও মুক্তিযুদ্ধের নানা তথ্য পাওয়া যাবে। এটিও বেশ সমৃদ্ধ একটি ওয়েবসাইট। এতে মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত অনেক মূল্যবান তথ্য রয়েছে। ১৯৯৬ সালের ২২ মার্চ প্রতিষ্ঠিত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর বাংলাদেশের আগামী প্রজন্মের জন্য তো বটেই, এ দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য লালনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।
মুক্তিযুদ্ধ-সম্পর্কিত বড় একটি দলিল তৈরি করেছেন দেশি-বিদেশি একদল ব্লগার (ব্লগ লেখক)। যাঁরা স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে গড়ে তুলছেন এই তথ্যভাণ্ডার। তাঁদের তৈরি জেনোসাইড বাংলাদেশ ওয়েবসাইটটিতে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত নানা পর্যায়ের তথ্য পাওয়া যাবে। এসবের পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধী এবং দেশীয় দালালদের তালিকা ও মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদও পাওয়া যাবে এ সাইটে। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ১৯৭১ সালে যে গণহত্যা চালিয়েছে সে সংক্রান্ত অডিও, ভিডিও, স্থিরচিত্র, ওয়েবসাইট ইত্যাদির একটি তথ্যসমৃদ্ধ আর্কাইভ রয়েছে এই সাইটে। এতে ইংরেজি এবং বাংলা উভয় ভাষার প্রচুর লেখা (রিডিং ম্যাটেরিয়াল) রয়েছে। এ সাইটে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা নিয়ে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের যে কেউ তাঁর করা ওয়েবভিত্তিক কাজগুলোর ওয়েবলিংক এখানে জমা দিতে পারেন। বিভিন্ন সময় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংগ্রহের কিছু উদ্যোগ বেশ প্রশংসনীয় হয়েছে।
বাংলাদেশ ’৭১ নামে একটি সিডি ১৯৯৬ সালে বের করে হাইটেক প্রফেশনালস নামের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রায় দুই হাজার পৃষ্ঠার তথ্যসমৃদ্ধ এ ডিজিটাল প্রকাশনাটিতে ছিল প্রায় এক হাজার দুর্লভ ছবি ও ভিডিওচিত্র। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবর রহমান জানান, এ সিডি প্রকাশের পর প্রচুর সাড়া পড়ে। বিক্রিও হয়েছে প্রচুর। তিনি জানান, শিগগিরই এ সিডিটি আবার বাজারে আসতে পারে এবং এর পাশাপাশি এসব তথ্য নিয়ে ওয়েবসাইটও তৈরি করা হবে।
মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডারদের সংগঠন সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের ওয়েবসাইটে সংরক্ষণ করা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের নানা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা মুহম্মদ জাফর ইকবালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বইটিও পাওয়া যাবে লিবারেশন ওয়ার ঠিকানায়। মাত্র ২২ পাতার এ বইয়ে মুক্তিযুদ্ধের নানা তথ্য পাওয়া যাবে। বাংলাপিডিয়া বিশ্বকোষে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রয়েছে নানা তথ্য।
অনলাইনে ব্লগ লেখকেরা যেসব বিষয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন, তার মধ্যে অন্যতম একটি বিষয় মুক্তিযুদ্ধ। সামহোয়্যারইন ব্লগে ব্লগারদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিভিন্ন লেখার একটি ই-বুক প্রকাশিত হয়েছিল। ফিরে দেখা ’৭১ নামের এই ই-বুকে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিভিন্ন তথ্য যেমন পাওয়া যাবে, তেমনি এতে উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এ প্রজন্মের ভাবনাগুলোও। ই-বুকটি পাওয়া যাবে ফিরে দেখা ’৭১ ঠিকানায়। মুক্তিযুদ্ধের আরও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ ১৯৭১ ওয়েবসাইট। মুক্তিযুদ্ধের নানা প্রামাণ্যচিত্র নিয়ে রয়েছে সেকুলার ভয়েজ নামের একটি ওয়েবসাইট। এতে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া স্বাধীনতাসংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রমের সংবাদ, ছবি, কলাম ইত্যাদি পাওয়া যাবে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ঘটিত যুদ্ধাপরাধ-সংশ্লিষ্ট তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ, আলোচনাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে রয়েছে ওয়ার ক্রাইমস স্ট্র্যাটেজি ফোরামের (ডব্লিউসিএসএফ) একটি ওয়েবসাইট। এ ওয়েবসাইটে নতুন তথ্য খোঁজ করার পাশাপাশি নতুন গবেষণা, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির নানা বিষয় রয়েছে। উইকি-প্রযুক্তিভিত্তিক মুক্তিযুদ্ধ উইকিয়া নামক প্রকল্পে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি, রাজনীতি, যুদ্ধের বিভিন্ন সংগঠন, মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলি, বইপত্রে মুক্তিযুদ্ধ নামে আলাদা আলাদা বিভাগ। মুক্তিযুদ্ধের নানা তথ্য পাওয়া যাবে ওয়াপিডিয়া নামের একটি মোবাইল উপযোগী সাইটে। মোবাইলে ব্যবহার উপযোগী এ সাইটে মুক্তিযুদ্ধের নানা তথ্য পাওয়া যাবে। বাংলাগ্যালারি ওয়েবসাইটে মুক্তিযুদ্ধকালীন নানা ছবি রয়েছে।
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সব তথ্য সহজ বাংলায় ইতিহাসভিত্তিক ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সংরক্ষণ করতে পারলে আগামী প্রজন্ম সঠিক তথ্য পাবে। এখন জরুরি ডিজিটাল মাধ্যমে থাকা মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন তথ্য একত্র করে সংরক্ষণ করা। তবেই ডিজিটাল দুনিয়ায় পাওয়া যাবে মুক্তিযুদ্ধের সব তথ্য।

** লেখাটি প্রথম আলো’র প্রজন্ম ডট কম পাতায় ২০১০ সালের ১০ ডিসেম্বর প্রকাশিত

Nurunnaby Chowdhury (Hasive)

This is Nurunnaby Chowdhury (Hasive) from Bangladesh. I work with Wikipedia since 2004 but I started contributing in 2008 on Bengali Wikipedia, Commons & Meta. I am one of Administrator of Bengali Wikipedia now and Director of Wikimedia Bangladesh. Also I am involve with Open Knowledge Foundation Network (OKFN) as Bangladesh Ambassador and Core Member of Creative Commons Bangladesh. Beside that I involve Open Source, Science, Math Olympiad activities since 2006. As job I work as Journalist & Social Media Interaction Expert of Highest Circulated Bengali newspaper in Bangladesh. My five book published already in our National Book Fair.

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *