"> জলে যখন আর্সেনিক বিষ – Nurunnaby Chowdhury

জলে যখন আর্সেনিক বিষ

46 0

সময়টা ২০০৬ সাল। বাংলাদেশের গভীর নলকূপের পানিতে আর্সেনিক পাওয়ার খবর তখন অনেকটা পুরোনো হয়ে এসেছে। সারা দেশের আর্সেনিক-উপদ্রুত এলাকাগুলোতে তখন আর্সেনিকমুক্ত সুপেয় পানি সরবরাহ করার জন্য নলকূপগুলোতে সবুজ, লাল রং করার পাশাপাশি ফিল্টার (পরিশোধক) লাগানোর মাধ্যমে আর্সেনিকমুক্ত পানি সরবরাহ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করে বেশ কয়েকটি দেশি-বিদেশি দাতা সংস্থা। ফিল্টার স্থাপন করে পানি পরিশোধনের ব্যবস্থাটি তখন বেশ দ্রুতগতিতে এগোচ্ছিল। কিন্তু কিছু এলাকায় প্রকল্প আকারে স্থাপন করার পর দেখা গেল, সেখানে আর্সেনিকের ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি মাত্রার আর্সেনিক পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণে ফিল্টারের মাধ্যমে আর্সেনিকমুক্ত পানি সরবরাহ করার প্রকল্পটি শুরুতেই ভেস্তে যায়। সে সময় সুইডেনের স্টকহোমের রয়াল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (কেটিএইচ) মাটি ও পানিসম্পদ প্রকৌশল বিভাগের দুই অধ্যাপক প্রসূন ভট্টাচার্য ও গুনার জ্যাকস ফিল্টারের বিকল্প হিসেবে কীভাবে সাধারণ জনগণের দোরগোড়ায় আর্সেনিকমুক্ত পানি সরবরাহ করা যায় সে বিষয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করেন। মূলত সেখান থেকেই তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন ভূগর্ভস্থ পানির আর্সেনিক ও অন্যান্য ক্ষতিকারক উপাদানবিহীন সুপেয় পানি সরবরাহ করার বিষয়টি নিয়ে। সে বিষয়টি নিয়েই ২০০৬ সালের দিকে কেটিএইচ ছাড়াও সুইডিশ পরিবেশ ব্যবস্থাপনা-সংশ্লিষ্ট একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রামাবাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগ এবং এনজিও ফোরাম ফর ড্রিংকিং ওয়াটার অ্যান্ড স্যানিটেশন (বর্তমানে পাবলিক হেলথ) যৌথভাবে সুইডিশ আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার কাছে এই প্রকল্প উপস্থাপন করে। প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল আর্সেনিক এবং অন্যান্য ক্ষতিকারক উপাদানবিহীন একটি টেকসই পানীয় জলের ব্যবস্থা করা। এভাবেই গোড়াপত্তন বাংলাদেশের পানির আর্সেনিক গবেষণার এক দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রকল্পের, যা সাসটেইনেবল আর্সেনিক মিটিগেশন (সাসমিট) নামে পরিচিত।

যেভাবে শুরুটা
২০০৬-০৭ সালে প্রকল্পটি উপস্থাপনের পর ২০০৮ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু হয়। প্রথমে বাংলাদেশের আর্সেনিক-উপদ্রুত অঞ্চলের মধ্যে চাঁদপুরের মতলবকে চিহ্নিত করা হয় এবং সেখান থেকেই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। এতে মতলব উপজেলার দুটি ইউনিয়নকে রাখা হয় কেন্দ্রবিন্দুতে। প্রকল্পের প্রথম লক্ষ্য স্থির করা হয়, ফিল্টার ব্যবহার করার পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট গভীরতায় নলকূপ স্থাপন করার মাধ্যমে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা। আর এ জন্য ইউনিয়ন দুটিতে স্থানীয় নলকূপ স্থাপন কারিগরদের সহায়তায় পরীক্ষামূলকভাবে অগভীর নলকূপ বসানো হয়। গবেষণা প্রকল্পে উল্লেখ করা হয়েছিল, প্রকল্পের লক্ষ্য থাকবে সর্বাধিকসংখ্যক উপকারভোগী এবং সর্বনিম্ন খরচে আর্সেনিকমুক্ত পানি সরবরাহ করা। মূলত এসব কারণে প্রকল্পের শুরু থেকে গভীর নলকূপের বদলে অগভীর নলকূপ বসানো হচ্ছিল। কারণ এর মাধ্যমে সস্তায় বেশিসংখ্যক টিউবওয়েল স্থাপন করা যাবে। অপর দিকে, বাংলাদেশে স্থানীয় পর্যায়ে গভীর নলকূপ স্থাপন করার মতো দক্ষ কারিগরের সংখ্যা অপ্রতুল বলে জানালেন প্রসূন ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, প্রকল্পটিতে মূলত ২০০৪ সালে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার প্রকাশিত নিরাপদ সুপেয় পানির নীতিমালাকে ব্যবহার করা হয়। শুধু খাবার পানির বিষয়টিকে মাথায় না রেখে স্বাস্থ্যভিত্তিক আর্সেনিক প্রভাব, খাবার পানির উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যায়ে আর্সেনিকের মাত্রা, পানি ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলোকে নজরে আনা হয়।

খনন এবং বালুর রং!
প্রকল্পের দ্বিতীয় বছরে শুরু হয় পিজোমিটার স্থাপন করার কাজ। পিজোমিটার হচ্ছে একধরনের যন্ত্র, যার সাহায্যে একটি নির্দিষ্ট গভীরতার জলাধারের পানির চাপ পরিমাপ করা যায়। পুরো মতলব এলাকায় সাতটি পিজোমিটার গুচ্ছ বসানো হয়। একেকটি পিজোমিটার গুচ্ছে মূলত পাঁচটি পিজোমিটার বসানো হয় (গভীর, মধ্যম, অগভীর), যাতে পানির চাপ এবং বিভিন্ন ঋতুতে পানির উচ্চতা নিরূপণ করা যায়। পরবর্তী কালে মোট ১৫টি পিজোমিটার স্থাপন করা হয়, যেগুলো থেকে সেডিমেন্ট সংগ্রহ করে বিভিন্ন উপাদানের মাত্রা নির্ণয় করা যায়।
শুধু একটি নির্দিষ্ট গভীরতাকে চিহ্নিত করা, যাতে টিউবওয়েল স্থাপন করার সময় সে গভীরতা থেকে আর্সেনিকমুক্ত পানি পাওয়া যায়। পিজোমিটার ছাড়াও ২৩টি পরীক্ষামূলক টিউবওয়েল বসানো হয়, যার মাধ্যমে পানিতে বিভিন্ন ক্ষতিকারক মৌলের উপাদান নির্ণয় করা হয়। এর মধ্যে বালুর রং মূলত একটি বিশাল ভূমিকা সৃষ্টি করে। রংভিত্তিক বালুকে ভাগ করা হয় সাদা, কালো, ঘিয়ে ও লাল রঙে। পরবর্তীকালে এসব রঙের বালি থেকে যখন পানি ওঠানো হয়, তখন দেখা যায়, লাল বালিতে আর্সেনিকের পরিমাণ যথেষ্ট কম থাকা সত্ত্বেও ম্যাঙ্গানিজ থাকে। আর পানিতে ম্যাঙ্গানিজের পরিমাণ এখন পর্যন্ত তেমন সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়নি। কিন্তু অতিসম্প্রতি কিছু গবেষণায় দেখা যায়, ম্যাঙ্গানিজের কারণে শিশুদের বুদ্ধিভিত্তিক বেড়ে ওঠা যথেষ্ট ব্যাহত হয়। এ কারণে মূলত মধ্যম মাত্রার গভীরতার (১২০-১৩৭) মিটারকে চিহ্নিত করে নিরাপদ পানি সরবরাহ করার টিউবওয়েল স্থাপন করা হয়। মূলত এভাবে ৩২০টি টিউবওয়েলের মাধ্যমে মতলব এলাকার জনসাধারণকে আর্সেনিক এবং অন্যান্য ক্ষতিকারক উপাদানবিহীন পানি সরবরাহ করা হয়।
আর্সেনিকমুক্ত পানি নিশ্চিত করার পাশাপাশি টিউবওয়েল প্ল্যাটফর্ম রংকে একটি চিহ্নিতকারী বিষয় হিসেবে নিশ্চিত করারও কাজ চলছে। কেটিএইচে স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী মো. আন্নাদুজ্জামান এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন। তিনি জানান, মূলত টিউবওয়েলের মেঝেতে আয়রন-অক্সাইডের কারণে লাল রঙের প্রলেপ পড়ে যায়। লাল কিংবা কালো রঙের টিউবওয়েলের কাঠামোর মেঝে দেখে সাধারণ জনগণ যেন খুব সহজে আর্সেনিক এবং ম্যাঙ্গানিজমুক্ত টিউবওয়েল থেকে পানি সংগ্রহ করতে পারে, সে বিষয়টি এই গবেষণায় প্রধান আলোচ্য বিষয় হিসেবে রাখা হয়েছে।

বাম থেকে পিএইচডি গবেষক আরিফিন সন্ধি, অধ্যাপক ড. প্রসূন ভট্টাচার্য, অধ্যাপক ড. গুনার জ্যাকস

ধানে আর্সেনিক!
খাবার পানির পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানিকে সেচকাজের জন্য ব্যবহার করা হয় বাংলাদেশে। উচ্চফলনশীল ধানের প্রজাতিগুলোতে বিপুল পরিমাণ পানির জোগান দিতে অগভীর নলকূপের সাহায্য নেওয়া হয়। মূলত এভাবে মাটির গভীরে থাকা আর্সেনিক ধানখেতের জমে থাকা পানিতে চলে আসে, যা পরবর্তী সময়ে ধানগাছের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে এবং চালে আর্সেনিক জমা হতে থাকে। জানালেন এ বিষয়ে পিএইচডি প্রকল্পে গবেষণারত আরিফিন সন্ধি। তিনি জানান, প্রাথমিক গবেষণায় গভীর নলকূপের পানিতে প্রচুর পরিমাণ আর্সেনিকের সন্ধান মিলেছে। বর্তমানে সংগৃহীত মাটিকে রাসায়নিকভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে। অচিরেই বিষয়টি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ আকারে প্রকাশ করা হবে।
কেটিএইচের পাশাপাশি বাংলাদেশের এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথ থেকে এই প্রকল্পের বাংলাদেশ সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ভূতত্ত্ববিদ মোহাম্মাদ হোসেন।
তিনি প্রথম আলোকে জানান, টিউবওয়েলের আর্সেনিক ছাড়াও আর্সেনিকের কারণে সামাজিক সমস্যা এবং পরিবর্তনগুলোর গবেষণা করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, বর্তমানে স্থানীয় পর্যায়ে নলকূপ কারিগরদের বিভিন্ন রকম প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যেন তারা আর্সেনিকমুক্ত নির্দিষ্ট গভীরতায় খনন করে নিরাপদ সুপেয় পানির ব্যবস্থা করতে পারে।
এই প্রকল্পের স্বপ্নদ্রষ্টা ড. ভট্টাচার্য বলেন, ‘সাসমিটের এই প্রকল্পের মাধ্যমে মতলবের একটি এলাকায় আর্সেনিকমুক্ত পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। আমরা আশা করছি, পরবর্তী সময়ে আমাদের এই প্রকল্পটিকে মতলব ছাড়াও বাংলাদেশের অন্য আর্সেনিক-উপদ্রুত এলাকাগুলোতে বাস্তবায়ন করা যাবে। কারণ, বাংলাদেশে প্রায় এক কোটি নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে এবং গ্রামের বিপুলসংখ্যক মানুষ এই নলকূপের পানির ওপর নির্ভরশীল।’ এই প্রকল্পের পাশাপাশি আণবিকস্তরে মাটি এবং ধানে আর্সেনিকের বিস্তার বিষয়ে গবেষণা কার্যক্রম চালানোর পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানালেন।
সাম্প্রতিক জলবায়ু পরিবর্তনের গবেষণার ডামাডোলে দেশের আর্সেনিক সমস্যার গবেষণা কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। অথচ আর্সেনিক সমস্যা নির্মূল তো হয়নি বরং তা আরও ছড়িয়ে পড়ার মতো উদ্বেগজনক তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে। এ সমস্যা কিছুটা হলেও কাটিয়ে উঠতে কেটিএইচের এই প্রয়াস নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।

আর্সেনিক যেভাবে আসে পানিতে
মাটিতে বিদ্যমান মৌলগুলোর পরিমাণের ভিত্তিতে শ্রেণীবিন্যাস করলে আর্সেনিকের অবস্থান ২০তম। সেখানে সমুদ্রের পানিতে ১৪তম এবং মানুষের দেহে ১২তম মৌলের অবস্থান দখল করে আছে। সাধারণত বিভিন্ন আকরিকের সঙ্গে আর্সেনিক বন্ধন আকারে থাকে। কিন্তু বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের কারণে এই আর্সেনিক ভূগর্ভস্থ পানির সঙ্গে মিশে যায়। বিভিন্ন রকম তথ্য ও গবেষণা প্রবন্ধের মাধ্যমে চারটি কারণকে প্রধান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে আর্সেনিকের পানির সঙ্গে মিশে যাওয়ার বিষয়কে। প্রথমত, আয়রন-অক্সাইডের ভেঙে যাওয়া। কারণ, আয়রন-অক্সাইড মাটির বিভিন্ন জৈব উপাদানের কারণে ভেঙে যায়। এ কারণে আয়রন-অক্সাইডের সঙ্গে যুক্ত আর্সেনিক পানিতে মিশে যেতে থাকে। দ্বিতীয়ত, উচ্চ পিএইচ থাকার কারণে পানি মাত্রাতিরিক্ত ক্ষারীয় হয়ে যাওয়া। এর ফলে ভূগর্ভের পানিতে আর্সেনিক মিশে যেতে থাকে। উল্লিখিত দুটি কারণ ছাড়াও সালফাইড অক্সিডেশন এবং ভূতাত্ত্বিক উষ্ণ পানির কল্যাণে ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের পরিমাণ বেড়ে যায়।
উপরিউক্ত কারণগুলো ছাড়াও পৃথিবীতে আর্সেনিকের দূষণ হয়ে থাকে। এসব দূষণকে মানবসৃষ্ট দূষণ বলা হয়। মূলত খনি থেকে আকরিক আহরণ, আগাছানাশক ব্যবহার, খনি থেকে বর্জ্য আকরিকের যথাযথ নিষ্কাশনের অভাবে আর্সেনিকের দূষণের আশঙ্কা বেড়ে যায়। তবে বাংলাদেশে আর্সেনিকের সমস্যা মূলত ভূতাত্ত্বিক কারণে সৃষ্ট, মানবসৃষ্ট আর্সেনিকের দূষণ বাংলাদেশে মূলত দেখা যায় না।

** ৬ মে ২০১২ তারিখে প্রথম আলোতে প্রকাশিত

Leave a Reply